পাঁচজন সেনা নামের নরপিশাচ আমাদের বাড়িতে এসে আমার পরনের কাপড় কেড়ে নেয়। তাদের চারজন আমাকে জোর করে মাটিতে চেপে ধরে রাখে। আমার শরীরে তখন তাদের বন্দুকের নল। এ অবস্থায় তাদের বাকি সদস্য আমাকে ধর্ষণ করতে থাকে। পালাক্রমে চলতে থাকে তাদের নৃশংসতা। এই কষ্ট বড়ই বেদনার।
এ কথা বলতে বলতে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন এক রোহিঙ্গা নারী। তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। বার্তা সংস্থা এপি সর্বশেষ ২৯ জন রোহিঙ্গা নারীর ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের বিষয়ে যে সাক্ষাতকার নিয়েছে তার মধ্যে একজন নারী এমন বর্ণনা দিয়েছেন। ওই নারীর নামের প্রথম শব্দের প্রথম অক্ষর ইংরেজি ‘আর’। তিনি বলেছেন, আগস্টের শেষের দিকে স্বামী ও ৬ সন্তানের মধ্যে ৫ জনকে তিনি তখন আমি বাড়িতে। হঠাৎ বাইরে আগুনে পুড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাই। আমরা দেখতে পাই আমাদের গ্রামে একের পর এক বাড়ি পুড়ছে। এ দৃশ্য দেখে আমার স্বামী দৌড়াতে থাকেন। কিন্তু সন্তানদের জন্য আমাকে বাড়িতে থেকে যেতে হয়। এ অবস্থায় ৫ জন সেনা সদস্য গর্জন করতে করতে আমার বাড়িতে প্রবেশ করে। ভয়ে আর্তনাদ শুরু করে আমার সন্তানরা। তারা ভয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু সেনারা আমাকে আটকে ফেলে। কেড়ে নেয় গলার হার। আমার শরীরের পিছন দিকে লাঠি মারতে থাকে। তাদের হাঁটু দিয়ে আঘাত করে। এতে আমি পড়ে যাই। আমার ওপর তাদের চারজন বন্দুক তাক করে ধরে। পঞ্চমজন আমার পোশাক কেড়ে নেয়। তারপর ধর্ষণ শুরু করে। পালাক্রমে তারা আমাকে ধর্ষণ করে। অবশেষে আমার স্বামীর সব পোশাক আর অর্থ নিয়ে চলে যায় তারা। এরপরের দিন আমরা বাংলাদেশের পথে পা বাড়াই। কিন্তু আমার শরীরে এতটাই ক্ষত ছিল যে হাঁটতে পারছিলাম না। চারদিন পরে আমরা পৌঁছি বাংলাদেশে।
আল্লাহই আমাদের বাঁচিয়েছেন
আগস্টের শেষ দিকে চার সন্তান নিয়ে বাড়িতে তখন নামাজ আদায় করছিলেন ‘এ’ (৫০)। এমন সময় তার গ্রাম ঘিরে ফেলে সেনারা। পুরুষদের গুলি করতে শুরু করে। ভয়ে কাঁপতে শুরু করেন ‘এ’। তিনি এতদিন শুনেছেন অন্য গ্রামে নারীদের ওপর মিয়ানমারের সেনাদের নরপিশাচের মতো উল্লাসের কথা। কিন্তু সেই নৃশংসতা তার ওপর নেমে আসে অবশেষে। ‘এ’ বলেন, গর্জন করতে করতে তিনজন সেনা সদস্য আমার ঘরে প্রবেশ করে। আমাকে টেনে বের করে আনে। আমি ঘর থেকে বের হতে রাজি না হওয়ায় তারা আমাকে প্রহার করে। এ সময় সন্তানরা আর্তনাদ করে। কিন্তু তাদেরকে সমবেদনা না দেখিয়ে থাপড়াতে থাকে তারা। বাড়ি থেকে বাইরে বের করে দেয়। সেনাদের দু’জন আমাকে আগাত করে। এতে আমি পড়ে যাই। আমার বুকের ওপর এক সেনা তার বুঁট দিয়ে চেপে ধরে। আমাকে মাটি থেকে উঠতে দেয় না। তারা কেড়ে নেয় স্বর্ণালংকার। কেড়ে নেয় পোশাক। আর্তনাদে আমি এ সময় আকাশবাতাস কাঁপিয়ে তুলি। কিন্তু সাহায্য করার কেউ নেই। এ অবস্থায় তাদের তিন জন আমাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করতে থাকে। যখনই আমি আর্তনাদ করি তখনই আমাকে লাথি মারে। আমার কাঁধে চাকু চেপে ধরে একজন। একে কেটে যায় কাঁধ। সেখান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। এখনও সেই কাটার দাগ আছে। চাকুর আঘাতে এতটাই কেটে যায় যে, আমার মনে হয়েছিল মারা যাচ্ছি। পরে এক কৃষক আমাকে বলেছেন, আমার স্বামীকে হত্যা করেছে সেনারা। তাই আমার ভাই, মা ও মেয়ে আমাকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে সাহায্য করে। আসলে সেনারা চায় আমাদেরকে রাখাইন থেকে, বিশ্বের বুক থেকে মুছে দিতে। তারা এ জন্য খুব বেশি চেষ্টা করেছে। কিন্তু রক্ষা করেছে আল্লাহ।
ধর্ষণে মারা গেল গর্ভস্থ শিশু
চারদিকে তখন অরাকজতা। সেনারা এগিয়ে আসছে। এমন অবস্থায় স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন ‘এম’। এ সময় তিনি ছিলেন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি চান নি ভাইকে ফেলে পালাতে। তার কিশোর ভাইয়ের জন্য অপেক্ষায় রইলেন তিনি। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়। এ অবস্থায় চারজন সেনা সদস্য তার বাড়িতে প্রবেশ করে। তাকে থাপড়াতে থাকে। ধাক্কাতে থাকে। তাদের তিনজন তাকে নিয়ে যায় বাড়ির বাইরে। সেখানে নিয়ে তাকে নগ্ন করে ফেলে এবং প্রহার করতে থাকে। তিনি আর্তনাদ করলে সেনারা তাদের বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেয় তার মুখের ভিতর। ‘এম’ বলেন, এরপর একজন সেনা সদস্য আমাকে ধর্ষণ করতে শুরু করে। অন্য দুজন আমাকে জোর করে মাটিতে ফেলে রাখে। গর্ভস্থ সন্তানকে লাথি মারতে থাকে। দ্বিতীয়জন আমাকে ধর্ষণ করার পর আমি তাদেরকে সজোরে লাথি মারি। এতে তারা ছিটকে পড়ে। আমি পালাই। কিন্তু আমার গর্ভে ক্রমশ ব্যথা বাড়তে থাকে। রাতে বাড়িতেই জন্ম হয় একটি শিশু কন্যা। কিন্তু সে জন্মে মৃত অবস্থায়। বাড়ির পাশেই এই নবজাতকে দাফন করি। এরপর ফিরে আসেন তার স্বামী। তার হাত ধরে তারা তিন দিন পাহাড়ি পথ ধরে হেটে আসেন বাংলাদেশে। ‘এম’ বলেন, সেনারা আমাদেরকে শেষ করে দিয়েছে। আমাদের জমিজমা সব ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের গরুছাগল সব নিয়ে গেছে। তারা আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন শেষ করে দিয়েছে।