আজ ২৮শে জানুয়ারি সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব, শিল্পসাহিত্য জগতের প্রিয় মানুষ কবি কামাল চৌধুরীর জন্মদিন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সফররত কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল রোববার বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের পালকি সেন্টারে তাকে ঘিরে বসছে স্বজন সমাবেশ। নিউইয়র্কে বসবাসরত কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবীসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ প্রিয় কামাল চৌধুরীকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাতে এতে যোগ দেবেন। সাউথ এশিয়ান রাইটার্স এন্ড জার্নালিস্ট ফোরামের ব্যানারে আয়োজিত ‌’কথা ও কবিতায় মিছিলের সমান বয়েসী’ শিরোনামে এ অনুষ্ঠানের মূল উদ্যেক্তা কবিবন্ধু সাংবাদিক আকবর হায়দার কিরন। সহযোগিতায় মুক্তধারা নিউইয়র্ক ও চ্যানেল আই।
১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি কামাল চৌধুরী কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিজয়করা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আহমদ হোসেন চৌধুরী ও মা বেগম তাহেরা হোসেনের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক (এস. এস. সি) এবং ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচ. এস. সি) পাশ করেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন এবং ব্যাচেলরস ও মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন।
কবি কামাল চৌধুরী একজন সুপরিচিত আধুনিক কবি। তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু প্রেম ও দ্রোহ ;– সমাজচেতনা তাঁর কাব্যপ্রেরণার অন্যতম সূত্র। তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য গীতিময়তা। তাঁর অন্যতম কাব্যগ্রন্থ টানাপোড়েনের দিন। যাতে তিনি মুক্ত ছন্দে নতুন এক কাব্যভাষার অনুশীলন করেছেন।
“সত্তরের দশকের অন্যতম প্রধান কবি কামাল চৌধুরী। যাঁর কবিতায় উঠে এসেছে মাটি, মানুষ, প্রেম, প্রকৃতি ও দেশপ্রেম। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কবিতার পটভূমি আত্ম-সচেতনতায় ঋদ্ধ দেশমাতৃকার অসাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশ কামাল চৌধুরীর কবিতার প্রধান উপজীব্য। দুঃশাসন থেকে মাতৃভূমি উদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত অমিততেজ তরুণ কবি কামাল চৌধুরীর অস্তিত্বজুড়ে ক্রমশ বেড়ে উঠতে থাকে। দেশপ্রেম, জন্মভূমি রক্ষার সংকল্প বাঙালি জাতিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের মহিমা জাগ্রত হয়েছে তাঁর কবিতায়।”

বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও পেয়েছেন উল্লেখযোগ্য অসংখ্য পুরস্কার।
তিনি ১৯৮০’ দশকের প্রারম্ভে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর কবিতায় সমসাময়িক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। তাঁর প্রথম গ্রন্থের নাম ‘মিছিলের সমান বয়সী’। যার মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে তাঁর কবিসত্তার প্রধান প্রবণতা। তিনি মূলতঃ গীতিকবিতায় সাবলিল। সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের মতোই তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের যৌথ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাঁর “হাড়ের গল্প” নামক কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের প্রভাব পড়েছে ছন্দে, শব্দচয়নে এবং বিষয়বিস্তারে এই ভাবেঃ

এই তো হাড়ের গল্প। আজ রাতে বিচ্ছিন্ন বধির

পরশ্রীকাতর মাংস এতদিন আঁঠাল স্বভাবে বেঁধে রেখে
আজ ফিরিয়ে নিয়েছে তার অন্ধমুখ।

অন্যদিকে ছন্দ এবং অন্তমিলে যে স্বাভাবিক দক্ষতা তাঁর রয়েছে তা কখনো কখনো পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।

বিকেলের কথা মনে আছে ভাঁটফুল

বৃষ্টিতে ভিজে বেড়াতে যে এল কারা
পিছল রাস্তা কাদামাখা আঁকাবাঁকা
বেড়াবার সুখ দুর্ভোগে দিশেহারা।

যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে মানুষের যন্ত্রণা, পীড়ন বিধস্ত জনপদ তাঁর ভাবনা জগতকে যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
তিনি লিখেছেন:

‘তখন স্বদেশজুড়ে শকুনের উড়াউড়ি, পাখসাটে
বয়ে আনে মৃত্যু
গ্রামগঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় তীব্র বেগে ধেয়ে আসেচ
চকচকে হেলমেটবাহী ট্রাক
মাঝরাতে কারো কোনো বিপন্ন চিৎকারেক
ছত্রখান হয়ে যায় হিম নীরবতা
ধারালো ছুরির মতো তীক্ষ্ম স্বরে কেঁদে যায়
ভয় পেয়ে নিশির কুকুর।’

(মুক্তি ও বিপ্লব-এর কবিতা, টানাপোড়েনের দিন)

জন্মদিনে শ্রদ্ধেয়জন প্রিয় কবি কামাল চৌধুরীকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here