সাইদুর রহমান লিংঙ্কন। একজন স্বপ্নচারী মানুষ। সাইকেলিস্ট, নাট্যকর্মী। সাইকেলে সওয়ার হয়ে চষে বেড়িয়েছেন গোটা দুনিয়া। ৩৬টির মতো দেশ তিনি ভ্রমন করেছন। বহন করেছেন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। এখন তিথু হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে। বিস্ময়, বেদনা এবং সুখ এই তিন এর মিশেলে সেই ভ্রমন কাহিনী নিয়মিত লিখছেন প্রবাস নিউজ ডটকমে। বাকিটা শোনা যাক তার কাছেই। ২য় পর্ব

একদিন সারাদিনের ছুটোছুটি শেষে আমি বাংলাদেশ দূতাবাসে গেলাম। ঠিক তখনই কুয়েতে কর্মরত জাতিসংঘ নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার মফিজুর রহমান দূতাবাসে ফোন করে আমার হাদিস জানতে চাইলেন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমার সঙ্গে সরাসরি আলাপ করিয়ে দিলেন। উনি কুয়েত টিভিতে আর কুয়েত টাইমস্-এ আমার সাক্ষাৎকার দেখেছেন। উনি আমার সাথে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা করতে চাইলেন। তার কথায় এতো আন্তরিকতা ছিল যে আমি কোন আপত্তি করতে পারলাম না। আধ ঘন্টার মধ্যে দু’জন সেনা সদস্য এসে আমাকে সৈনিকদের গাড়িতে করে ব্রিগেডিয়ারের বাসভবনে পৌঁছে দিলেন। সুন্দর সাজানো গুছানো বাসা। সিকিউরিটি আর অন্য লোকজন। উনার ছোট দুটি বাচ্ছার সাথে কথা হচ্ছিল। তারপর উনার মা আসলেন। আমি কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদ গ্রামের কথা বলতেই তিনি যেন তার অতীতে ফিরে গেলেন। আমার পাশের গ্রামের ধলেশ্বরে তার জন্ম। তিনি শৈশবের কথা জুড়ে দিলেন। কতবার খেলার ছলে ছুটে চলে গিয়েছেন আমাদের গ্রামে। ইনিয়ে-বিনিয়ে খোঁজ নিলেন পরিচিত জনদের। পাড়ার পরিচিত তেঁতুল গাছটি, সবচেয়ে পুরানো বাড়িটি, এখনো ঠিক আগের মতো আছে কিনা? কথা বলার মাঝে রহমানের স্ত্রী আসলেন। আলাপচারিতার মাঝে জানলাম মুন্সিগঞ্জের টরকিতে তার বাড়ি এবং তার বাবাও একজন মেজর। যাই হোক একই এলাকার ছেলে বিশ্বভ্রমণের মতো এতো বড় একটি কাজ করছে এ কারণে সত্যি উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিলেন। বিদায়ের সময়ে তাদের তহবিল থেকে আমার বিশ্বভ্রমণের জন্য অযাচিতভাবে বড় অংকের একটি অনুদানও দিয়েছিলেন। তাদের এসব ব্যবহারে আমিও খানিকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, দূরত্বই বুঝি মানুষে মানুষে আত্মিক নৈকট্যকে আরো ঘন করে।
বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ওয়াপরা কুয়েত (সৌদি বর্ডার ঘেঁষে) বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সবা সাথে সেখানে হৈ চৈ করতে করতে চলে গেলাম। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আমাকে কিছু বলতে হত। অনুষ্ঠান শেষে সবাই আমাকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো। যেমন, কেমন করে সাগর পাড়ি দিলাম? সাইকেলটা কোথায়? বাড়ি কোথায়? ইত্যাদি ইত্যাদি। ওয়াপরা আসার সময় আমি একটি প্রাইভেট কারে এসেছিলাম আমাদের সঙ্গে একটি বাসও ছিল। ফেরার পথে আমি সবার সঙ্গে বাসে ফিরেছিলাম। চারদিক মরুভূমি। কিছু কুয়েতী লোক কৃত্রিমভাবে সব্জির বাগান করেছে।
মরুভূমির উপর সেই বাগানে কাজ করে বাঙ্গালীরা। ছোট ছোট ঘর তুলে তারা সেখানে থাকে। রোদের তাপে তারা অনেকটা মিশমিশে কালো হয়ে গেছে। অনেক কষ্ট, তবুও তারা জন্মসূত্রে পাওয়া রাজনীতি ছাড়তে পারছে না। যদিও রাজনীতিটা হল রাজা-বাদশাহের দুর্নীতি, যা ভারত উপমহাদেশ ছাড়া আর কোথাও এতোটা পরিলক্ষিত হয় না।
বাস মরুভূমি দিয়ে ছুটে চলছে। কুয়েত তখন ভীষণ ঠান্ডা, আর এই ঠান্ডার আমার বুকে কফ্ জমে গিয়েছিল। হঠাৎ মনে হল ঔষুধ খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে। তখন বাসের মধ্যে অনেকের নিকট পানি চাইলাম। কারো কাছে না পেয়ে ভাবলাম এত ছোট একটা ক্যাপসুলটি ভিজে মুখের লালা দিয়েই গিলে ফেলা যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। কিন্তু ক্যাপসুলটি ভিজে মুখের ভিতর আঠালো হয়ে গেল। গিলে ফেললাম। কিন্তু এখানেই শেষ না, ক্যাপসুলটি গলায় আটকে গেল। কিছুতেই গিলতে পারছি না আর কথাও বলতে পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার চোখ দুটি যেন বড় হয়ে বের হবার উপক্রম কিন্তু পানি নেই। হঠাৎ সেই মুহুর্তে বাস তেল নেয়ার জন্য একটা গ্যাস স্টেশনের সামনে থামে। আমি এক সেকেন্ড দেরি না করেই দরজা খুলেই দৌড়। সামনে একটা সোডার ভেন্ডিং মেশিন থেকে দিনার ঢুকিয়ে কোক নিয়ে গলায় ফেঁসে যাওয়া ক্যাপসুলটাকে গিলে নেই, আর সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। বুঝলাম ‘ঔষুধ আর বিদ্যা এই দুটি নিয়ে ফাঁকিবাজি করতে নেই’।
অপরাহ্নে যাবার সময় এক মজার কান্ড হয়েছে। প্রাইভেট কারে যাদের সাথে গিয়েছি তারা শুধু নিজেরা ছাড়া অন্য কাউকে নিতে চায়নি। তবে নেতা টাইপের কিছু লোক আমাকে আর তার এক পরিচিত বন্ধুকে তার কারে তুলে দেয় কিছুটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আমরা পিছনে বসে আছি। চুপচাপ কারো মুখে কোন কথা নেই। আমরাও তাদের উপর কিছুটা মনক্ষুন্ন ভদ্রলোকের স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই গাড়িতে। গাড়ি হাইওয়ে ধরে চলছে তো চলছেই….। ভদ্রলোক হঠাৎ করে বলল, যাই হোক আমার গাড়িতে যখন এসে পড়লেন মন খারাপ করে আর কি হবে? পরিচয় পর্বটা সেরে ফেলা যাক। নিজের পরিচয় দিলেন আর আমার পরিচয় জানতে চাইলে আমি চুপ করে থাকি। কিন্তু আমার পাশের জন চট্ করে আমার পরিচয় দিয়ে দিল। সাথে সাথে আমি গাড়ির হার্ডব্রেকের শব্দ শুনতে পাই। ক্ষণিকের মধ্যে রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ভেতরে লাইট জ্বালিয়ে বলে, সরি ভাই আপনি আমার গাড়িতে জানতাম না। আপনাকে দেখার জন্য কুয়েত সিটিতে অনেক খুঁজেছি। আজ ভাগ্য আপনার সাথে এভাবে সাক্ষাৎ করিয়ে দিল। আলোতে চেহারাটা আনেন একটু। পরিচয় পর্বে ভদ্রলোক আমার বাড়ির ঠিকানা জানতে পেরে কিছুটা কাচুমাচু হয়ে গেলেন। উনি আমার একই থানার পাশের ইউনিয়নের। দেশে মসজিদে ইমামতি করতেন। কুয়েতে এসে দাঁড়ি কামিয়ে ভদ্র মহিলার সঙ্গে (স্ত্রী নন) লিভ টুগেদার করছেন।
রমজান মাস। কুয়েতী বাসে লোকজনের ঠাসাঠাসি। ছোট ছোট ৩/৪ টা ছেলে। মাথায় টুপি। সবার ছোট যে সেও এতো লোকের সামনে খুব করে সিগারেট টানছে। কেউ কিছু বলছে না। বয়স বড়জোড় বার কি তের হবে কিন্তু সিগারেট ফুকার স্টাইল দেখে মনে হয় যেন পাকা ধূমপায়ী। যাই হোক ক্যামেরাটা বের করে একটু কাছ থেকে এমনভাবে একটা ছবি তুললাম যেন মনে হয় বাইরের কোন দৃশ্যের ছবি তুলছি কিন্তু না রক্ষ হল না। ওরা তিনজন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো ক্যামেরা থেকে ফিল্মটা খুলে নেয়ার জন্য। আমি এক ফাঁকে ফিল্ম খুলে পকেটে ঢুকিয়ে দেই আর একটা খারাপ ফিল্ম ঢুকিয়ে দেই ক্যামেরায়। শেষ পর্যন্ত ঐ খারাপ ফিল্মটা ওদেরকে দিয়ে রেহাই পাই। এর মধ্যে কুয়েতী প্রতিবাদ করলো না। আমি যতই বোঝানোর চেষ্টা করলাম ওদের ছবি তুলিনি।
আরবরা ছিল বর্বর জাতি। আর তাইতো আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে সেখানে পাঠিয়েছেন হেদায়েত করার জন্য। তবুও একটা কথা আছে, কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। আজও তারা অনেকটা বর্বর রয়ে গেছে। বহু লোক কাজ করছে মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছে না। খাবার পাচ্ছে না। মরুভূমিতে বালুর উপর কোন রকম থাকার ঘর তুলে দিয়ে ভারত উপমহাদেশের লোকজন রাখছে দুম্বা, উট পালার জন্য। হয়তো শুকনো রুটি আর পানির গ্যালন ভরে দিয়ে আসে খাওয়ার জন্য যা ৩/৪ দিন চলবে। অথচ ৫/৬ দিন পরে তারা আবার যায় দুম্বা আর উটদের খবর নিতে, কিন্তু মানুষ নামে প্রাণীটার জন্য নয়।
আমি দূতাবাসে অনেক সময় কাটিয়েছি। দেখেছি কত নাজমা, জাহানারা আর সেলিনাদের কান্না। অনেকেই এসেছে দেখে ছেলে-মেয়ে রেখে, সংসারের কথা চিন্তা করে। শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে এদেশে এসেছে ঝি বা বাসাবাড়ির কাজ করতে। মালিকরা অনেক অত্যাচার করে, আমার মালিক ভাল হলে তাদের ছেলে-মেয়েরা খারাপ। প্রতিদিন কুয়েত দূতাবাসে ৮/১০ জনের বেশি মেয়ে মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে আসে। তারা দেশে ফিরতে চায়। কিন্তু দূতাবাসের চতুর লোকের ফাঁদে পড়ে আর কালো চশমা পরিহিত ভদ্রলোকদের খপ্পরে পড়ে দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। আমি অনেক মেয়ের সাথে কথা বলেছি। শীতের রাতে কম্বল ছাড়া শোয়া মুশকিল। দূতাবাসের গেটের সামনে বাগানের মধ্যে কান্নার শব্দ। বাগানের গাছগুলোর জন্য দেখা যাচ্ছে না। এগিয়ে যাচ্ছি দেখার জন্য। সামনে গিয়ে বোন সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করলাম। অনেক কথার মাঝে বেরিয়ে এলো কুয়েতী মালিকের অত্যাচারের কথা। আরেকটা কথা না বললেই নয় যে, মালিকের অনুমতি ছাড়া কুয়েত কেউ ছেড়ে আসতে পারে না। মালিক শত অন্যায় করলেও তাদের কোন বিচার নেই।
কথায় কথায় ওরা কসম কাটে। ওরা প্রত্যেকটি কথায় আল­াহ্কে ডাকে, অথচ অন্যায় অত্যাচার করে ইবলিশের মত। পাশের ইউনিয়নের পাইনা বাজারের মেয়ে। নাম গোপন রাখা হলো কারণ আমার বোনের ইজ্জত বলে কথা। মালিকের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার তাগিদে সে দূতাবাসে এসেছে। তাকে সেখানে থাকার জায়গা দেয়া হয়নি। কারণ দূতাবাস বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বাংলাদেশ সমিতির শওকত সাহেবকে ঘটনাটা জানিয়ে তার ব্যবস্থা করলাম। তার বক্তব্য শুনে মালিকের উপর ধিক্কার এসে গেল। রান্নাঘরে কাজ করার অবস্থায় মালিক তাকে ধর্ষণ করে। এখানেই শেষ নয়, মালিকের ছেলেও তাকে রেহাই দেয়নি। সেই বাড়ির সবাই সবকিছু জেনেও না জানার ভান করে থাকে। কারণ পুলিশ পর্যন্ত গড়ালে তাদের গর্দান যাবে।
সুন্দরী মেয়েরা মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে আসে দূতাবাসে। আর সেখানকার শ্রম বিভাগের কর্মকর্তারা আবার তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে মালিকের কাছে নতুবা অন্য কোন কাজের কথা বলে হাসাবিয়া বা আব্বাসিয়া অন্ধকার গলিতে। সেখানে কালো চশমাধারীদের সন্ত্রাস বাহিনী আর পুলিশের ছত্রছায়ায় নির্বিকারে চলছে দেহ ব্যবসা; যা বাংলাদেশীদের মান ইজ্জত নিয়ে কথা তুলছে সবাই। একটা মাস্তান বাহিনীর সাথে মিশতে গিয়ে ভেতরের অনেক খবর জানতে পারলাম। তারা চাঁদা নাকি ঘরে বসেই পায়। অনেকেরই ভিসা নেই কিন্তু কালো চশমাধারীদের আর্শীবাদ আছে তাদের উপর। কুয়েত প্রশাসনের লোকজনদের ৮/১০ জন করে স্ত্রী! বৃদ্ধ যে লোকটা সিংহাসনে তার মহলেই ৮/১০ জন স্ত্রী। তার সবচেয়ে ছোট স্ত্রীর সমবয়সী নিজের নাতনী আছে। কুয়েতে লক্ষণীয় ব্যাপার হল- বাঙ্গালী নারী-পুরুষ সকলেই জোড়া বেছে নিয়ে লিভ টুগেদার করছে। অবশ্য নিজেরা নিজেরাই। যাই হোক অনেক কথাই হলো কুয়েত বসবাসকারী বাঙ্গালীদের ব্যাপারে আর সুন্দর কুয়েতের কুৎসিত কুয়েতীদের সম্পর্কে। যদিও তারা কুয়েত সিটিটাকে সুন্দর করে সাজিয়েছে কিন্তু নিজেদের অন্তরটাকে সাজাতে পারেনি। বহুলোকের দুঃখ আর বুক ভরা কান্নায় কুয়েতের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যাচ্ছে। আমরা কুয়েত দেখে যেমন সুন্দর বলি তেমনী কুয়েতীদের দেখেও যেন সভ্য আর ভাল বলতে পারি সেই দিনটার অপেক্ষায় থাকলাম। তথাপি আমাদের বাঙ্গালী ভাই-বোনদের ভালবাসা, সহযোগিতা ও উৎসাহ আজও আমাকে নাড়া দেয় প্রবলভাবে। কুয়েতে যাদের সাহচর্য হৃদয়ে দাগ কেটে আছে তারা হল মান্নান, আখতার, চয়ন, কামাল, বশির, প্রদীপ, মহিউদ্দিন, ব্রিগেডিয়ার মফিজুর রহমান।
সৌদী আর জর্ডানের ভিসা না পেয়ে সিরিয়ার ভিসা নিয়ে চলে যাই দামেস্ক। সেখানে কুয়েতে কাজ করতো এক সিরিয়ান ভদ্রলোক, তাদের বাসায় উঠি। তবে ঈদ মোলাকাতে টিকিট পেতে কষ্ট করতে হয়। আমি যেদিন সিরিয়ায় যাচ্ছি তার আগের দিন আমার পূর্ব নির্ধারিত ভ্রমণসঙ্গী উজ্জ্বল আসলো ইরান থেকে কুয়েতে। আমাকে ধরার জন্য সে ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে তেহরান তারপর কুয়েতে এসেছে।