থামছে না গাড়ির উল্টোপথে যাত্রা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ শাখা মিলে মামলা হয়েছে মোট ৯৬ হাজার ৫১৫টি। তার মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার মামলা হয়েছে উল্টোপথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। মামলা ছাড়াও জরিমানা করা হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩ হাজার ৮৪৫ টাকা। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, আইন অমান্য করে উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে চলাচলকারীদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন ভিআইপির বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হয়েছে। এ কারণে উল্টো পথের যাত্রা কিছুটা হলেও কমেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (ট্রাফিক) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ঢাকায় প্রত্যেকটি রাস্তা এবং মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা এবং কর্তব্যরত সার্জেন্ট খুব সতর্ক হয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই কাউকে উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে চলাচল করতে দেয়া হবে না। কিছুদিন আগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন আমলাকে উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য মামলা দেয়া হয়েছে। আমরা কোনোভাবেই কাউকে ছাড় দেবো না। মামলার সংখ্যা বাড়ায় প্রমাণ করে যে, আমরা আইনলঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে খুব কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করছি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের ৯৬ হাজার ৫১৫টি মামলার মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার ৭০০টি মামলা হয়েছে শুধু মাত্র উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। দিনে গড়ে প্রায় ১৫০০টি উল্টো পথে যাওয়ার জন্য মামলা দেয়া হয়েছে। বাদবাকি মামলা হয়েছে গাড়ির লাইসেন্স না করা, গাড়ির লাইট ঠিক না করা, হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা, হুটার ও বিকন লাইট ব্যবহার করা ও গাড়িতে কালো গ্লাস লাগানোর কারণে।
ট্রাফিক পুলিশের সূত্র থেকে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে শুধু উল্টো পথে যাত্রার জন্য ১ তারিখে মামলা হয়েছে ১০০০টি, ২ তারিখে ১১৯৬টি, ৩ তারিখে ১৩০৪টি, ৪ তারিখে ২০০টি, ৫ তারিখে ৪৫০টি, ৬ তারিখে ৩০০০টি, ৭ তারিখে ১৯৯০টি, ৮ তারিখে ৫৬৩টি, ৯ তারিখে ৯৯০টি, ১০ তারিখে ১০১০টি, ১১ তারিখে ১০০০টি, ১২ তারিখে ২০০০টি, ১৩ তারিখে ১৯২০টি, ১৪ তারিখে ২০৮০টি, ১৫ তারিখে ৯৮০টি, ১৬ তারিখে ১২১০টি, ১৭ তারিখে ২০০০টি, ১৮ তারিখে ২৪০০টি, ১৯ তারিখে ২০০০টি, ২০ তারিখে ১৮৬৬টি, ২১ তারিখে ২১৩৪টি, ২২ তারিখে ১০০০টি, ২৩ তারিখে ১০০০টি, ২৪ তারিখে ১০০০টি, ২৫ তারিখে ১০০০টি, ২৬ তারিখে ১০০০টি, ২৭ তারিখে ৯৩০টি, ২৮ তারিখে ২০৭০টি, ২৯ তারিখে ১৮৯০টি, ৩০ তারিখে ১১১০টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় উল্টো পথে গাড়ি চলাচলের কারণে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে চলতি অক্টোবর মাসের ৯ই অক্টোবর ৪৩৮টি, ১০ই অক্টোবর ৪০৬টি, ১১ই অক্টোবর ৫০৪টি, ১২ই অক্টোবর ১৬৫০টি হামলা হয়েছে। পুলিশের অভিযানের কারণে দিন দিন মামলার সংখ্যা কমছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ট্রাফিক বিভাগে সব বিষয়ে সর্বমোট মামলা হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৫৫টি। জরিমানা আদায় হয়েছে ৪৫ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৮৫০ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে মামলা হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৯৪টি।
জরিমানা করা হয়েছে ৪০ কোটি ৮০ লাখ ২ হাজার ২১৭ টাকা। মার্চ মাসে মামলা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৬৮টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৬ কোটি ১১ লাখ ৩ হাজার ৪৫০ টাকা। এপ্রিলে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৬০টি। জরিমানা আদায় ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৫০ টাকা। মে মাসে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার ৩১৩টি। জরিমানা আদায় ৫০ কোটি ৫০ লাখ ৩১১ টাকা। জুন মাসে মামলার সংখ্যা ৭৮ হাজার ৪৮৩টি। জরিমানা আদায় ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ৬ হাজার ৮৭৫ টাকা। জুলাই মাসে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ৬১টি। জরিমানা আদায় ৪৫ কোটি ৫১ লাখ ৫৮৭৬ টাকা। আগস্ট মাসে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৮টি। জরিমানা আদায় ৫৩ কোটি ৮৫ লাখ ৬ হাজার ৪৪৫ টাকা।
ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলা মোটরে ঢাকা মেট্রো-ঘ(১৫৪৮৮৯) নম্বরের একটি গাড়ি আটক করে ট্রাফিক পুলিশ। গাড়িটি হচ্ছে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মাফরুহা সুলতানার। তবে তিনি গাড়িতে ছিলেন না। এ সময় গাড়ির চালককে একটি মামলা দেয়া হয়।
এ ছাড়াও গত ২৬শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বিজয় স্বরণীর মোড়ে উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় ট্রাফিক পুলিশ ঢাকা মেট্রো-ঘ (১১-৫৮৩০) নম্বরের একটি গাড়ি আটক করে। সেই গাড়িটি হচ্ছে জাতীয় সংসদের সিনিয়র সচিব আব্দুর রব হাওলাদারের। এ সময় তিনি গাড়িতেই ছিলেন। গাড়ি উল্টো পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৭০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আইন আছে কিন্তু, আইন কেউ মানতে চায় না। তখন পুলিশ বাধ্য হয় আইন প্রয়োগ করতে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ উল্টো পথে গাড়ি চলাচল রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি নাগরিককে এই বিষয়ে সতর্ক হতে হবে এবং ধৈর্য ধারণ করে রাস্তায় চলাচল করতে হবে।