শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে, শীতের মিষ্টি আমেজ শুরুর মুহূর্তে চলে প্রকৃতির পালাবদল। এরই মাঝে শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবীর আগমনের বার্তা ধ্বনিত হয় সর্বত্র। প্রকৃতি সাজে বহুরূপে প্রস্তুত হয় দেবী বরণে। দেবী মহামায়া আসছেন অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করতে আর শুভশক্তির বিজয় সূচিত করতে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ঢাকের ছন্দে উৎসবের আমেজের শুরু হয়।
ষষ্ঠী পূজা দিয়ে শুরু হয় পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গাপূজা। তবে এরও সাত দিন আগে হয় মহালয়া। সপ্তমী, অষ্টমী এরপর নবমী, একে একে অফুরন্ত আনন্দ আর হইচইয়ের মধ্য দিয়ে পূজার দিনগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন। কি এক অজানা বিয়োগ-ব্যথায় মনটা টন টন করে ওঠে।
চণ্ডীতে উল্লেখ আছে ‘দুর্গম’ নামের এক অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয়েছে ‘দুর্গা’। দুর্গম অসুরের কাজ হল জীবকে দুর্গতি প্রদান করা। দুর্গমকে বধ করে যিনি জীবজগৎকে দুর্গতির হাত থেকে অব্যাহতি দেন তিনি মা দুর্গা। দুর্গম অসুরের দুই রূপ। সংসার পথে এই অসুরের নাম ‘স্বার্থান্ধতা’। আধ্যাত্মিক পথে এ অসুরের নাম ‘অবিদ্যা। স্বার্থান্ধতায় পতিত হয়ে জীব অশেষ দুর্গতি ভোগ করে। দুর্গম অবিদ্যার অধীন হয়ে জীব দুঃখ-দুর্দশার মায়াজালে জড়িয়ে পড়ে। মা দুর্গা জ্ঞান-অসি দিয়ে অবিদ্যার বন্ধন ছেদ করে জীবের এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দান করেন ।
দুর্গার অসংখ্য বাহু। তার বাহুগুলো পালনী শক্তির প্রতীক। অসংখ্য বাহু দ্বারা অসংখ্য সন্তান তিনি পালন করেন। দেবী মূর্তিতে এ অসংখ্যের প্রতীক দশ। দশ হাতে তার দশটি অস্ত্র। ডান দিকে ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, তীক্ষ্ণবাণ শক্তি। আর বাম দিকে খেটক (ঢাল), ধনু, পাশ, অঙ্কুশ ও ঘণ্টা (কুঠার)।
অস্ত্রগুলোর প্রতিটি আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। যেমন: ‘ত্রিশূল। এটি দ্বারা তিনি স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ জীবের এই তিন প্রকার দেহ লয় করে সিদ্ধ দেহ জাগিয়ে দেন। তেমনি ‘খড়গ’ অর্থ তত্ত্বজ্ঞানের অসি। এটি দ্বারা তিনি সাধকের অজ্ঞানতা নাশ করেন। দুর্গার প্রতিটি অস্ত্রের ব্যবহারিক ও পারমার্থিক অর্থ আছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন মা দুর্গা। মায়ের বামচরণ, কটি ও গ্রীবা ঈষৎ বাঁকানো। ডান চরণ রেখেছেন সিংহের পিঠে সরলভাবে। বাম চরণ রেখেছেন অসুরের স্কন্ধোপরে বা বক্ষোপরে।
সমুদ্র মন্থনে লক্ষ্মীর উৎপত্তি। সমুদ্র মন্থনে রত্ন মিলবেই। বিশ্বপ্রকৃতিও একটি সমুদ্রের মতো। যারা বিচক্ষণ তারা ভূমি প্রকৃতি কর্ষণ করে শস্যধন আহরণ করেন। কেবল টাকাকড়িই ধন নয়। চরিত্র ধনও মহাধন। যার টাকা নেই সে ‘লক্ষ্মীহীন’। যার চরিত্র ধন নেই সে ‘লক্ষ্মীছাড়া’। যারা সাধক তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মুক্তিধন। তারা লক্ষ্মীনারায়ণ ভজনা করেন মুক্তি পাওয়ার আশায়।
সর্বজীবের জীবিকার উৎস লক্ষ্মীদেবী। ইনি স্বর্গে ‘স্বর্গলক্ষ্মী’, রাজগৃহে ‘রাজলক্ষ্মী’। যাদের জীবন পবিত্র তাদের সংসারে ‘গৃহলক্ষ্মী’। লক্ষ্মীর আর একটি রূপ ‘নদী’। লক্ষ্মী শাপভ্রষ্টা হয়ে পদ্মানদী রূপে প্রকাশিত হয়েছেন। আমরা ভাগ্যবান। পূর্ববঙ্গে ইনি পদ্মানদীরূপে প্রবাহিত হয়ে এই পবিত্র ভূমিকে সুফলা শস্য-শ্যামলা করে রেখেছেন।
গণেশ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অংশ। পুত্রলাভের জন্য শিবের আদেশে পার্বতী বিষ্ণুর আরাধনা করেছিলেন। শ্রীবিষ্ণুরও ছিল জগজ্জননীর মাতৃত্বের পিপাসা। তাই এলেন পুত্ররূপে। শনির দৃষ্টিতে গণেশের শির স্কন্ধচ্যুত হয়। প্রাচীনকালে যখন নবগ্রহ আবিষ্কৃত হয় তখন শনিই ছিলেন শেষ গ্রহ। অর্থাৎ সূর্য হতে সবচেয়ে দূরেব গ্রহ শনি। অনন্ত আকাশকে শনিই সীমার মধ্যে এনেছেন। এজন্য শনি সীমাবদ্ধতার প্রতীক। অসীম শ্রীবিষ্ণু সসীমের মধ্যে এসে শির হারালেন। ঐরাবতের শির কেটে এনে যুক্ত করে দিয়ে বাঁচানো হল গণেশকে।
দেবী সরস্বতী মায়ের জ্ঞানশক্তি। দেবীর হাতে পুস্তক ও বীণা। সরস্বতী শুদ্ধ জ্ঞানময়ী প্রকাশস্বরূপা। জ্ঞানের সাধক হতে হলে সাধককে হতে হবে দেহে মনেপ্রাণে শ্বেত-শুভ্র-শুচি। সরস্বতীর বাহন শ্বেতহংস। জল আর দুধ মিশিয়ে দিলে হাঁস তা থেকে দুধ গ্রহণ করে জল ত্যাগ করে। যথার্থ জ্ঞানী বিবেকের বলে বস্তু হতে অসার অংশ বাদ দিয়ে নিত্য সার অংশগ্রহণ করে। সত্য গ্রহণের মধ্যেই জ্ঞান সাধনার ভিত্তি স্থাপিত হয়।
হর-পার্বতীর তপস্যালব্ধ সন্তান হল দেবসেনাপতি কার্তিক। কার্তিক ক্ষাত্রশক্তির মূর্তি। কার্তিকেয় ক্ষাত্রবীর্য। সরস্বতী দিবেন নীতি। লক্ষ্মী দিবেন সম্পত্তি। গণেশ দিবেন পরিশ্রম। কার্তিক দিবেন পরাক্রম। তারকাসুরকে বধ করে স্বর্গ-ভ্রষ্ট দেবতাদের পুনরায় স্বর্গে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কার্তিক। পরাধীন দেবতাদের স্বাধীন করেছিলেন এই দেবসেনা কার্তিক, যিনি যুবশক্তির প্রতীক।
সিংহ রজোগুণের প্রতীক। সিংহ দুর্দান্ত পশুশক্তি। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই পশুশক্তি আছে। অসুর ঘোর তমোগুণের মুক্তি। মায়ের সঙ্গে অসুরের যুদ্ধস্বত্ব ও তমোগুণের লড়াই। এই লড়াইতে তারই জয় অবশ্যম্ভাবী যার পক্ষে থাকবে রজোশক্তি। রজোমূর্তি সিংহ আছে মায়ের পক্ষে। তাই জয় সুনিশ্চিত।
মা দুর্গা যদিও আঘাত করেন অসুরকে, তার মধ্যেও মঙ্গল ইচ্ছা বিদ্যমান। নিষ্ঠুরভাবে মা যে অসুর সন্তানকে আঘাত করেন তার মধ্যেও তার কৃপা আছে। আঘাত দিয়ে শুভবুদ্ধি জাগানোর চেষ্টা করেন। যেসব অসুর তার হাতে মৃত্যুবরণ করে তারা পরম গতি লাভ করে থাকে।
কলা-বৌর শাস্ত্রীয় নাম ‘নবপত্রিকা’। নবপত্রিকা বলতে নয়টি গাছের চারা বোঝায়। নয়টি গাছের চারাকে শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে কলা-বৌ সাজানো হয়। প্রত্যেকটি চারার এক একজন অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন। কদলীতে আছেন ব্রাহ্মণী, কচুতে কালিকা, হরিদ্রাতে দুর্গা, জয়ন্তীতে কার্তিকী, বেলের অধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বে রক্তদন্তিকা, অশোকে থাকেন দেবী শোকরহিতা, মানের চামুন্ডা ও ধানের লক্ষ্মী।
ধর্ম যার যার আনন্দ হোক সবার। সনাতন ধর্মীদের এ বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ থাকুক। আমরা ধর্ম নিয়ে কাউকে আঘাত দিয়ে কথা না বলি। অন্যের ধর্ম কে সম্মান করি। কোনও ধর্ম অশান্তির জন্য নয়। শারদীয় এ উৎসবে বাঙালির জীবন শুভ ও সুন্দর হোক। কল্যাণ বয়ে আনুক সমগ্র পৃথিবীর।