বয়স জিনিসটা যেন উড়ন্ত শিমুল তুলার বীজের মতো। ধরতে গেলেই দূরে সরে যায়। একসময়ে যে ছিল নেহাত ‘ছেলেটা’ সেই হঠাৎ করে যেন ‘লোক’ হয়ে যায়। যাকে আমরা ছেলেটা-ছেলেটা বলে ডাকতুম হঠাৎ তাকে অন্য লোকেরা ‘উনি’ বা ‘ওই লোকটি’ বা ‘ওই ভদ্রলোক’ বলে ডাকতে শুরু করে ‘ছেলেটা’ ঠিক কবে ‘লোক’ হয়, তা কি বলা যায়? কিংবা সে কথা সে কি নিজেও জানে? লোকটি বা ভদ্রলোকটিও কবে যেন একজন প্রৌঢ় বা বুড়ো মানুষ হয়ে যায় অন্যদের চোখে। রাস্তায় এক ভদ্রলোককে দেখেছিলাম প্যান্টের ওপর বেশ একটা চকরাবকরা হাওয়াই শার্ট পরা, পায়ে চটি, মাথার চুল সাদা, ফুচকাওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে মনের সুখে ফুচকা খেয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখে যে কেউ ভাববে এক বুড়োর একী ভিমরতি! কিন্তু সেই পাকা মাথার লোকটি কিন্তু সেই মুহূর্তে ‘ছেলেটা’ হয়ে আছে। ভুলেই গেছে নিজের বয়স।

মানুষের যৌবন ততদিনই অক্ষুণ্ন থাকে, যতদিন সে বিস্ময়বোধ হারায় না। সবজান্তাভাব যারা করে তারা অনেক ব্যাপারেই ঠকে যায় যে মানুষ অবাক হতে পারে, সে নিত্যনতুন কিছু আবিষ্কার করে। যৌবনবোধ বজায় রাখার আর একটি লক্ষণ প্রেমের প্রতি আগ্রহ। প্রেমের সঙ্গে জড়িত থাকে সৌন্দর্যবোধ। এই বোধটা যারা হারায় তারা অল্প বয়সেই বুড়ো হয়ে যায়। এ রকম অল্পবয়সী বুড়োও তো আমরা অনেক দেখি। এক-একজন লোক প্রাণ খুলে হাসে না। উদারভাবে প্রশংসা করতে জানে না, তাদের মনে হয় জন্ম-ভুল। প্রেম কি কখনো যায়? এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেক মানুষই সারাজীবন ধরে একটু একটু করে বুঝতে শেখে। তারপর শেষ উত্তরটা সে নিজেই নিয়ে চলে যায়। লেখক, শিল্পীদের মনোভাব তবু আমরা কিছুটা বুঝতে পারি, কারণ তারা তা প্রকাশ করে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ? বাইরে থেকে তাকে দেখে যাই মনে হোক, তার মনের কথাটা কে জানতে পারে?

এই প্রসঙ্গে একটা কথা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর একটা সম্পর্ক ছিল। সেটা কি স্নেহ? না প্রেম? না শরীর সম্পর্কহীন বন্ধুত্ব? দু’জনের মধ্যে বয়সের অনেক তফাৎও ছিল। ওকাম্পো তখন যুবতী হলেও রবীন্দ্রনাথের বয়স বাষট্টি-তেষট্টি। রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি হিসেবেই বড় নন, একজন পুরুষ হিসেবেও শ্রেষ্ঠ বলা যেতে পারে, সেই বয়সেও শক্তি-সামর্থ্য অক্ষুণ্ন ছিল। প্রেম তার মন থেকে কোনোদিনই যায়নি, তা আমরা তার শেষ বয়সের কবিতা পড়েটাই বুঝতে পারি। নারীর শারীরিক সৌন্দর্যের প্রতিও তার আকর্ষণ যে অক্ষুণ্ন ছিল ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরাও বলেন, কোনো মানুষের যদি মনের যৌবন অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে আশি-বিরাশি বছর বয়স পর্যন্তও যৌনক্ষমতা বজায় রাখা স্বাভাবিক। চার্লি চ্যাপলিন কিংবা বার্ট্রান্ড রাসেল তার প্রমাণ দিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধীও এই বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা করেছেন এবং এর আধুনিকতম উজ্জ্বল উদাহরণ রবিশঙ্কর। প্রেমের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক কোনোদিনই শেষ হবে না। কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা কেউ কোনোদিন দিতে পারবে না। শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও প্রেম হবে না কেন? হতে পারে। দুজনের মাঝখানে একটা নদী বা একটা সমুদ্র বা একটা মহাদেশের ব্যবধান থাকলেও প্রেমের সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার জল যেমন জলকে চায়, মানুষের শরীরও শরীরকে চায়। চাওয়ার তীব্রতার ওপর নির্ভর করে প্রেম। শুধু শরীরের সম্পর্ক নয়, শরীরের সৌন্দর্যের অনুসন্ধান এবং মিলনের আনন্দের হাজার রকম অনুভূতি, এও তো প্রেমের অঙ্গ। নিম্নস্তরের প্রাণীরা প্রেম তেমন জানে না, শুধু শারীরিক ভোগেই তাদের নিবৃত্তি। মানুষের মধ্যেও অনেকে ওই নিম্নস্তরেই থেকে যায়। সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের ধারণারও অনেক বদল হয়েছে। অনেক আদিবাসী সমাজে এখনো চুম্বনের প্রচলন নেই। চুম্বন ব্যাপারটাই তারা জানে না। আবার শিল্প অনুভূতি যাদের প্রবল, একটি চুম্বনেই তারা মিলনের আনন্দ পেয়ে যেতে পারে। শুধু আঙ্গুলে আঙ্গুল ছোঁয়াতেও তো শারীরিক মিলনও হয়। আমার বয়স এখন একশ’ দুই বছর। যতদূর মনে হয়, আমি তিনশ’ বছর বাঁচব। সুতরাং আমি এখন প্রথম যৌবনেই আছি, বলা যেতে পারে। আমি যখন প্রকৃতিকে দেখি, তখন তার সব কিছুর মধ্যেই নারীর উপমা খুঁজে পাই। ঝরনার জলের শব্দ, এসব কিছুর মধ্যেই কোনো না কোনো নারীর রূপকল্পনা আসে। এর থেকে যে একটা মধুর রস পাই, সেটাই যেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। টেবিল-চেয়ারে যখন বসে থাকি, তখন দূর থেকে কেউ হয়তো আমাকে দেখে ভাবে একজন গম্ভীর মানুষ। কেউ কেউ এসে সে কথা বলেও ফেলে। আমি তখন মনে মনে হাসি। আমার মনের মধ্যে যে কখন কী খেলা চলছে, তা যদি অন্যেরা জানতে পারত? এমন অনেক মনের কথা সারাজীবনেও বলা হবে না।

শিল্পী রেনোয়া বলেছিলেন, তিনি যদি নারীদের না চিনতেন, তাহলে একটাও ছবি আঁকতেন না। আমার জীবন থেকেও যদি দৈবাৎ কখনো প্রেমের অনুভূতি চলে যায়, তাহলে সেই মুহূর্তেই আমি লেখা বন্ধ করে দেব। যে কোনো বিষয়ে, এমনকি সম্পূর্ণ নারীবর্জিত কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে গেলেও মনের ভেতরে ঝরনার ধ্বনির মতো একটা প্রেমের অনুভূতি থাকে। দেশপ্রেম, সমাজপ্রেম বা দরিদ্রপ্রেম নিয়ে যে যতই মাতামাতি করুক না কেন? একজন নারী ও একজন পুরুষের প্রেম পড়ন্ত বয়সের কেবল একটা ডেফিনেশন হয় কি? যারা অসাধারণ তাদের কি পড়ন্ত বয়স হয়? তারা যেন সেই কল্পবৃক্ষ যার পাতাগুলো প্রত্যেক বসন্তেই চিরনবীন। তবে যাদের বলা যায় আমজনতা তাদের জীবনে পড়ন্ত বয়স, ব্যক্তিগত শোক, বিফলতা, হতাশা, অপ্রত্যাশিত আঘাত কিংবা কোনো ঘ্যানঘেনে রোগের সমাহার। তখন তারা আর পাদপ্রদীপের আলোয় নেই। তলিয়ে থাকে প্রদীপের নিচের একটা নন-এনটিটি-অন্ধকারে। আবার কেউ কেউ যারা যৌবনে যৌন সচ্ছলতার স্বীকৃতি পেয়েছেন, তারা পড়ন্ত বেলার রূপ ও আকর্ষণ হারানো অস্তিত্ব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন।

কিন্তু প্রেমের সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি কিশোরী বয়সে প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম বাল্মীকি প্রতিভার রবীন্দ্রনাথের যৌবন মূর্তিকে দেখে। আবার প্রেমের সঙ্গে অনেকেরই আজীবন দেখাই হয় না। কেউ কেউ প্রেমের একটা কণা পেলে কি কৃতার্থ হয়ে মুক্তারস নিঃসারিত করে নিজস্ব মুক্তা বানাতে পারে।

স্নেহমাত্রই নিম্নগামী। অপত্য স্নেহ তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু প্রেম ঊর্ধ্বগামী। তা নিজের প্রয়োজনে নিজের রাস্তা বানিয়ে নেয়। তখন সমাজ, সংসার সম্পর্ক, বয়স, রূপ, গুণ, নিয়ম, নিগড় সব তুচ্ছ হয়ে যায়। আমার উপলব্ধিতে মনে হয়েছে আমি আমার জীবনে যাদের ভালোবেসেছি, নিয়ে গেছি অন্তরের অন্তরতম লোকে, আপাতদৃষ্টিতে তারা ভিন্নপথের মানুষ হলেও মূলত তাদের দর্শন বাদ দিয়ে কোনো সৃষ্টিই সম্ভব নয়। কেউ কেউ একটা বয়সে পৌঁছে এই সাধারণ প্রেমকে তুচ্ছ করে ঈশ্বরপ্রেমের দিকে চলে যান। প্রত্যেক নারীকেই তারা তখন মা বলে ডাকতে শুরু করেন। যৌন কামনা, বাসনাকে অস্বীকার করেন বা নিন্দনীয় মনে করেন। ঈশ্বরের করুণা পাওয়াই তাদের কাছে পরম কাক্সিক্ষত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মুশকিল হচ্ছে এই, এই ধরনের অনুভূতি সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে বা বোধে কোথাও একটা মিল আছে। আমার শৈশবের প্রাণের কবি, কৈশোরের ‘ইস্ট’ এবং উত্তর কৈশোরের প্রেমিক যেন ত্রিবেণীর মতো মিলিয়ে গেছেন ভিতরে কোথাও। তিনটি ধারা থেকেই আনন্দ সঞ্চারিত হয়েছে, জীবনের পাত্র পূর্ণ হয়ে গেছে মাধুরীতে। যতক্ষণ দেহ, ততক্ষণ যৌনতা। না হলে তো কেবলই একটা ভেজিটেবল অস্তিত্ব।