একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যানার, ফেস্টুন ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত। নির্বাচন কেন্দ্র করে তারা উন্নয়নমূলক কাজ, জনসভা, পথসভা, র‌্যালিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। শুধু নির্বাচনী প্রচারণা নয়, জনসাধারণের সুখ-দুঃখের অংশীদারিত্বের প্রমাণ দিতে তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও তরুণ কর্মীদের কাছে টানছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ এলাকায় নির্বাচনী আমেজ তৈরি করেছে। চায়ের দোকানগুলোতে চলছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। এবারের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণেও নির্বাচনী প্রচারণার আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। গোপালপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও ভূঞাপুর উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা নিয়ে টাঙ্গাইল-২ নির্বাচনী এলাকা। ১৯৭৩ সালে ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদার ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টির মো. হাতেম আলী খানকে পরাজিত করেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী আফাজ উদ্দিন ফকির জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মো. হাতেম আলী তালুকদার। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামছুল হক তালুকদার ছানু আওয়ামী লীগের মো. হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৮৮ সালে জাসদের (সিরাজ) আ. মতিন হিরু নির্বাচিত হন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির শামছুল হক তালুকদার ছানু। ১৯৯১ সালের ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আ. সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিএনপির আবদুস সালাম পিন্টু পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবদুস সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামানের কাছে হেরে যান। ২০০১ সালে বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামানকে পরাজিত করে তৃতীয় বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন আবদুস সালাম পিন্টু। আবদুস সালাম পিন্টু পান ১ লাখ ৫ হাজার ২৭৩ ভোট এবং খন্দকার আসাদুজ্জামান পান ১ লাখ ২ হাজার ৯৯৯ ভোট। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার আসাদুজ্জামান। আবদুস সালাম পিন্টু ২১শে গ্রেনেট হামলা মামলার কারণে কারাগারে থাকায় তার ছোট ভাই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। নির্বাচনে খন্দকার আসাদুজ্জামান পান ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭১০ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু পান ১ লাখ ৩ হাজার ৫০৯ ভোট। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামান ও জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) আবদুল আজিজের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার আসাদুজ্জামান।
বর্তমান এমপি খন্দকার আসাদুজ্জামান বয়সের কারণে এলাকায় তেমন একটা আসছেন না। তার জায়গায় মনোনয়ন চাইবেন ছেলে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক পরিচালক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল। তিনি এলাকায় এসে গণসংযোগ চালিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগের আরো ৪-৫ জন নেতা নিজ নিজ আঙ্গিকে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আশরাফুজ্জামান স্মৃতি, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক তানভীর হাসান ছোট মনির, গোপালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু, কর্নেল মির্জা হারুন অর রশিদ (অব.), ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল হালিম অ্যাডভোকেট, ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ। এদিকে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি ও যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু অনেকটাই নিশ্চিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যাওয়ায় দলীয় চেয়ারপারসনের সবুজ সংকেত পেয়ে পুরোদমে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এ আসনে নির্বাচন করেছেন তার বড় ভাই কেন্দ্রীয় বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাগারে থাকায় তার স্থলে এ আসনটিতে মনোনয়ন দেয়া হয় সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে। বিএনপির বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী নির্বাচনে আবদুস সালাম পিন্টু অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে তিনিই এ আসনে মনোনয়ন পাবেন। সে ক্ষেত্রে সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে অন্যত্র মনোনয়ন দেয়া হবে। আর যদি সালাম পিন্টু নির্বাচন করতে না পারেন তাহলে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির প্রার্থী নিশ্চিত। এ আসনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন সাবেক এমপি শামছুল হক তালুকদার ছানু। এদিকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াত এ আসনে অনেকটা নিষ্ক্রিয়। তবে গোপনে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দলটির এক নেতা জানিয়েছেন।
এ আসনটিতে বড় দু’দলেই রয়েছে কোন্দল। তবে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির কোন্দল অনেকটা তুঙ্গে। ভূঞাপুর উপজেলা পৌর বিএনপিতে দুটি কমিটি রয়েছে। একটির উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা ও অন্যটির সাবেক পৌর মেয়র আবদুল খালেক। তবে অধিকাংশ নেতা-কর্মী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফার অনুসারী। কিন্তু বয়স্ক বেশিরভাগ নেতা-কর্মী আবদুল খালেক মণ্ডলের পক্ষে। এবার বন্যায় ত্রাণ বিতরণের সময় উভয় কমিটির লোকজনকে পৃথকভাবে ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা গেছে। অপরদিকে দলীয় কোন্দলের কারণে এক যুগেরও বেশি সময় আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই চলছে ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। দলটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ। তবে আশার আলো হচ্ছে, দলীয় অবস্থান মজবুত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে তিনটি ইউনিয়নের কমিটি দিতে পেরেছেন। কিন্তু বহিষ্কৃত ত্যাগী নেতা ও এমপি অনুসারীদের বাদ দিয়ে কমিটি হওয়ায় প্রকাশ্য না হলেও ভেতরে ভেতরে কোন্দল রয়েই গেছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের একাধিক নেতা-কর্মী। আগামী নির্বাচনে এর চরম প্রভাব পড়বে বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ধারণা। এছাড়াও আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে খ্যাত গোপালপুরেও রয়েছে ব্যাপক কোন্দল। গোপালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হালিমুজ্জামান এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মো. রকিবুল হক ছানার মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এখন দুটি অংশে বিভক্ত। দলীয় কার্যক্রমেও পড়েছে ভাটা। এদিকে এ উপজেলায় বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই চলছে দলটি। আহ্বায়ক খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম ও যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম লেলিনের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। কেউ কারো ছায়া দেখতেও নারাজ। ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে বিশৃঙ্খলা। বিভক্ত হয়ে পড়েছে দু’টি অংশে।
নির্বাচন কমিশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪২৮। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৩ হাজার ৩৯ জন এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৯ জন।