বেশ কয়েকবারই পরিকল্পনা হয় মধুপুরের রাবার বাগানে যাওয়ার। কিন্তু যান্ত্রিক জীবনের সাথে পাল্লা দিয়ে তা আর হয়ে ওঠে না।

অবশেষে পরিকল্পনামাফিক ঢাকা থেকে এক সন্ধ্যায় মোবাইলে কল দিলাম ইদ্রিস ভাইকে। তিনি মুক্তাগাছায় থাকেন। শ্রদ্ধেয় বড়ভাই। কথা হলো কমপক্ষে যেন দুটো বাইক রেডি রাখে। সাথে আরো চারজন থাকবে। যেভাবে বলা সেভাবেই কাজ, কয়েকদিন পর চলে গেলাম ময়মনসিংহে আমার বাড়িতে।
কিন্তু বাড়ি যাবার যাত্রায় মহা ফাপড়। যানজটের কারণে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যেতেই পুরো রাত লেগে গেল। সাথে গেল ছোট ভাই শিবলী।

ওর খুব সখ মধুপুরের গড়ে ঘুরে বেড়ানোর। ঢাকা থেকে অফিস শেষে রাত ৮টায় রওনা দিয়ে ভোর ৪টায় পৌঁছাই। শীতের রাত। তাই কোনভাবে পোশাক বদলে চলে গেলাম লেপের নিচে। সকাল হতে মা বোনের চিৎকার, চেঁচামেচি আর হাকডাকে ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে উঠেই রেডি হয়ে গেলাম। সকালের নাস্তা সেরে বের হওয়ার আগেই আরো যারা যেতে পারেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। জানা গেল ইউসুফ ভাই, ছোটন ভাই, শিবলি আর আমি যাচ্ছি।

পরের দিন ১৬ ডিসেম্বর থাকায় কাজের চাপে যেতে পারলেন না ইদ্রিস ভাই। বাইক পাওয়া গেল দুটো। রওনা দিতেই আমাদের দুপুর হয়ে গেল। মুক্তাগাছা প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। বাইক এগিয়ে চললো ধীর গতিতে। রসুলপুর গিয়ে থামলো বাইক। মধুপুর গড়ের পাশ দিয়েই চলে গেছে আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তা। আগে থেকেই ঠিক করা, আমরা যাব কমলাপুরের রাবার বাগানে। সেখানে পৌঁছানোর আগেই রাজাবাড়ীতে দুপুরের চা-চক্রের নিমন্ত্রণ পেয়ে গেলাম। শেষ হলো চা-চক্র।
এর পর আবার ছুটলো বাইক। এতক্ষণ রাস্তাটা ছিল পিচঢালা। হঠাৎ পিচঢালা পথ থেকে নেমে গেলাম মেঠোপথে। দুপাশে সবুজ অরণ্য আর বাড়ি ঘরের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলছে দুটো বাইক। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম কমলাপুর রাবার বাগানের ভেতরে। বাইক থেকে নেমেই সবাই ছোটাছুটি করে দেখতে লাগলো রাবার বাগানের সৌন্দর্য। ছবি তোলা পর্বও চললো সমানতালে।
সবার আগ্রহ ছিল রাবার বাগানের কষ বা রাবারের কাঁচামাল সংগ্রহের বিষয়টি। সবাই দেখতে লাগলাম। সারি সারি গাছ দেখলেই মনটা ভরে যায়। যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ আর গাছ। মাঝখান দিয়ে তৈরি রাস্তাগুলো মন কাড়বে। দেখতে পেলাম কষ সংগ্রহের চৌম্বক দৃশ্য। মনে হলো, গাছ থেকে যেন দুধের নহর বইছে। খেজুরের রস সংগ্রহের মতো গাছের ছাল বা আঁশ কেটে তৈরি হরা হয় এক ধরণের নাল। সেই নাল বয়েই পড়তে থাকে কষ। মূলত কষ সংগ্রহের জন্য রাতের বেলায় এক ধরনের প্লাাষ্টিকের বাটি বসিয়ে দেওয়া হয় কাটা নাল বরাবর মাটিতে। সারা রাত কষ পড়ে বাটি পূর্ণ হয়ে থাকে। সেখান থেকে সকাল বেলায় কারখানায় নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে কষকে রাবারে রূপান্তর করা হয়।

বেশ কিছু মনোমুগ্ধকর সময় কাটিয়ে গেলাম রাবার প্রকল্পের ব্যবস্থাপকের অফিসে। প্রকল্পের অফিসে ডুকতেই এগিয়ে এলেন দুজন। এর মধ্যে একজন দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পরিচয় পেয়ে তারা ফোন দিল ব্যবস্থাপক সাহেবকে। তাদের ফোনেই কথা হলো ব্যবস্থাপক শহিদুল ভাইয়ের সাথে। বেশ কিছু তথ্যও পাওয়া গেল তার কাছ থেকে। কবে থেকে শুরু হয় এ প্রকল্প, কারা কীভাবে কাজ করেন, রাবার সংগ্রহের প্রক্রিয়াসহ নানা দিক। এরপর শহিদুল ভাইয়ের ডেপুটি আশরাফুল ভাই আমাদেরকে সব প্রক্রিয়া ঘুরে দেখালেন। অবশেষে চা চক্রের অনুরোধ থাকলেও সময় স্বল্পতার কারণে সবাই মিলে ছবি তোলা শেষে ফেরার পথ ধরলাম।

কেউ কমলাপুর রাবার বাগানে বেড়াতে যেতে চাইলে যাওয়া যাবে দুই ভাবে। এক হলো- বাইক নিয়ে। অন্য মাধ্যমটি হলো সিএনজি। টাঙ্গাইলের মধুপুর বা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে রিজার্ভ নেওয়া যাবে। দরকষাকষির মাধ্যমে ভাড়া মিটিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। বাইক ভাড়া পাওয়া যাবে মুক্তাগাছার কালীবাড়ি থেকে। যারা রবার বাগানে ঘুরতে যেতে চান তারা বাগানে ঘোরাঘুড়ির পাশাপাশি কারখানায় গিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে রাবার প্রক্রিয়াকরণও দেখতে পারবেন।