আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বাবার কাছ থেকে শুনেছি। বড়দের কাছ থেকে জেনেছি।বই পুস্তক থেকে জেনেছি। কত অশ্রু, কত লাশ, কত ধর্ষণ, কত গুম-খুন আর হাহাকারের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় তা অনুধাবন করেছি। ঠিক তেমনিভাবে ১৯৯৫ সালের এক ভোর আমাকে সবসময়ই নাড়া দেয়। আমি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। শিশির ভেজা মাঠে মিষ্টি রোদ। বাবা আমার এক কোণে বসে দৈনিক বাংলা পত্রিকা পড়ছেন। আমি লক্ষ্য করলাম বাবার চোখে অশ্রু। বাবা আবেগপ্রবণ। পাশে গিয়ে জানতে চাইলাম, কি হল বাবা? বাবা বললেন-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। তুই শুনিস নি-“অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন, তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হৃদয়ে লাগিল দোলা। জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা, কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী, গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি-“এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।”—–জি শুনেছি- তাহলে বল এ ঘোষণার পর আর কোন কথা আছে? আমি বললাম সত্যিই তো এটাই তো স্বাধীনতার ঘোষণা। তখন তিনি বললেন- ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মকাল কতই না বেদনার। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের এমন বর্বর গণহত্যা, নারীদের ধর্ষণ এবং পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। মুক্তিযোদ্ধারাই রক্ত নদী পাড়ি দিয়ে বাঙ্গালীদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়েছে। তারপর এক এক করে বলতে শুরু করলেন মুক্তিযুদ্ধে উনার অংশগ্রহণের ইতিহাস। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে ২ নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা লেঃ কর্নেল জাফর ইমামের নেতৃত্বে ফেনীর বিলোনিয়া সীমান্তে প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছেন কচুরিপানা বেষ্টিত ডোবায় পানির মধ্যে নাক উঁচু করে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার করুন ইতিহাস। এভাবেই অনেক কষ্ট করে ৬ই ডিসেম্বর ফেনী কে পাক হানাদার মুক্ত করার কথা। এর মধ্যে তিনি হারিয়েছেন চাচাতো ভাই-বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসলা উদ্দিন চৌধুরী কে। আর সম্মুখ যুদ্ধ করে বীরের বেশে ফিরে এসেছেন তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম, তার ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন, চাচাতো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিব উদ্দিন দুলাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা বোরহান উদ্দিন আহমেদ , ও ভাগিনা বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউল‍্যাহ। আর এভাবেই ৩০ লক্ষ শহীদ ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমাদের দিয়েছেন লাল-সবুজের পতাকাআবৃত একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।—-শিবলী ছাদেক শিবলু , সভাপতি-প্রজন্ম ‘৭১ যুক্তরাষ্ট্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here