রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও রাখাইনে অবিলম্বে মানবাবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের (ইউএনএইচআরসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ৪০টি মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন। এতে বলা হয়েছে, এ জন্য একটি প্রস্তাব পাস করতে হবে।

এতে বলা হয়েছে, গত বছর অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে উদ্বেগজনক হারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর মার্চে ৩৪তম অধিবেশনে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গঠন করে ফ্যাক্ট ফাইর্ন্ডি মিশন অন মিয়ানমার (এফএফএম)। তাদের এ বিষয়ে রিপোর্ট দেয়ার কথা রয়েছে আগামী বছর মার্চে। এর প্রেক্ষিতে ওই ৪০টি মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ৬ দফা সুপারিশ পেশ করেছে।

তা হলোÑ ১. মার্চে রিপোর্ট দেয়ার কথা এফএফএমের। এই সময়সীমা বধিত করতে হবে। ২. এমন একটি ধারা বা প্রভিশন যুক্ত করুন যার ফলে এফএফএম ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট উত্থাপন করে এবং ২০১৮ সালের জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও সাধারণ অধিবেশনে যাতে তারা চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে। ৩. এফএফএম’কে জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সুবিধা দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানাতে হবে। ৪. এফএফএমের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি যোগাযোগ করলে তার বিরুদ্ধে যেকোনো রকম প্রতিশোধ নেয়ার বিরুদ্ধে বিচার করতে হবে, এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধ করতে হবে মিয়ানমারকে। এসব বিষয়ক জোরালোভাবে তাদেরকে জানিয়ে দিতে হবে। ৫. সাম্প্রতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতে হবে। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ৬. মানবিক সহায়তাকর্মী ও নিরপেক্স পর্যবেক্ষকদের আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ দিতে হবে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য ও পর্যবেক্ষক দেশগুলোর কাছে লেখা খোলা চিঠিতে এসব কথা বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, মিয়ানমারের, বিশেষ করে রাখাইন প্রদেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। রিপোর্ট বলছে, গত দু’সপ্তাহে কমপক্ষে দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই সংখ্যা আরো উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। সেখানে কয়েক হাজার অমুসলিমও আভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া ও শত শত মানুষ হত্যার খবর বেরিয়ে আসছে। জাতিসংঘের তিনজন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর ৩১ শে আগস্ট তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যার ঘটনায় এই নিন্দা জানান। তারা আরো জানান, সাধারণ মানুষের ওপর হেলিকপ্টার ও রকেট চালিত গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এই হত্যাকা- চালানো হচ্ছে। ৫ই সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদেরকে জাতি নির্মূলের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরাঁ। ওই খোলা চিঠিতে আরো বলা হয়, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও মানবিক ত্রাণ সহায়তা বিষয়ক এজেন্সিগুলোকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। সেখানে মিডিয়াকে রাখা হয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। সেখানে ভয়াবহ আকারে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়, এ বছর ফেব্রুয়ারিতে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাই কমিশনারের অফিস (ওএইচসিএইচআর) থেকে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। বিবৃত্তি দেয় জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর। তাতে বলা হয়, ২০১৬ সালের শেষের দিকে ও ২০১৭ সালের শুরুর দিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে শিশুদের। ঘরের ভিতর মানুষ রেখে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘটেছে গণধর্ষণ। যৌন সহিংসতা। ওএইচসিএইচআর তার রিপোর্টের উপসংহারে বলেছে, রাখাইনে মানবতার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ ঘটেছে। ওই সময় সেনাবাহিনী যে অভিযান চালায় তা বর্তমান অপারেশনের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। তখনও রাখাইন ছেড়ে বাণের পানির মতো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বহু সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। তথ্য রাখা হয় গোপন করে। কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিককে ওই অঞ্চলে যেতে দেয়া হয় নি। ২৫ শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (এআরএসএ) পুলিশ ও সেনাদের ৩০টি পোস্টে হামলা চালায়। তার প্রতিশোধ নিতে সেনারা ব্যাপক অভিযানে নামে। এ থেকেই সহিংসতা শুরু। কিন্তু এই সহিংসতা শুরুর আগে ১১ই আগস্ট মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর রাখাইনে সেনা উপস্থিতি, তাদের অবস্থান নেয়া ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক একটি কমিশন মিয়ানমার ইস্যুতে রিপোর্ট প্রকাশের পর পরই বর্তমান সহিংসতার শুরু হয়। কফি আনান কমিশনের ওই রিপে৪ার্টে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানানো হয়। সব পক্ষকে সহিংসতা এড়িয়ে চলতে ২৯ শে আগস্ট আহ্বান জানায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার। উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্যের নিন্দা জানাতে আহ্বান জানানোর হয় সরকার প্রধানের কাছে। কিন্তু তাতে সায় মেলেনি। উল্টো সরকার বর্তমানের সঙ্কট, হামলায় আন্তর্জাতিক সাহায্য বিষয়ক সংগঠনগুলো সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে সরকার। এ অবস্থায় সেখানে ত্রাণকর্মীরা বিপদের মুখে রয়েছেন। তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি ত্রাণ সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওই খোলা চিঠিতে আরো বলা হয়, ২০১৬ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া সহিংসতার পর পূর্ণাঙ্গ মানবিক সুবিধা পুনঃস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার। মানবাধিকার বিষয়ক আইন ও মানবিক আইন লঙ্ঘনের যে অভিযোগ রয়েছে তা সংস্কারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সরকার। রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর ফলে এ সম্প্রদায়টি বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ওই খোলা চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের আসন্ন ৩৬তম অধিবেশনে মিয়ানমার বিষয়ে একটি প্রস্তাব আনতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। তাতে মিয়ানমারের ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে উল্লেখ থাকতে হবে। এই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ৪০টি মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হলোÑ অলটারনেটিভ আসিয়ান নেটওয়ার্ক অন বার্মা (অল্টসিয়ান), আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস, এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার, আওয়াজ ফাউন্ডেশন পাকিস্তান- সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস, বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে, বাইটস ফর অল পাকিস্তান, কায়রো ইন্সটিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ, সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস- ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়া, ক্রিশ্চিয়ান সলিডারিটি ওয়ার্ল্ডওয়াইড, সিভিকাস: ওয়াল্ড এলায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, সিভিল রাইটস ডিফেন্ডারস, কমিশন ফর দ্য ডিঅ্যাপেয়ারড অ্যান্ড ভিক্টিমস অব ভায়োলেন্স, কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ, কোনেকটাস ডিরেইটোস হিউম্যানোস, ডিফেন্ড ডিফেন্ডারস, ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পারসোনাল রাইটস, এফআইডিএইচ-ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, গ্লোবাল সেন্টার ফর দ্য রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, হিউম্যান রাইটস ওয়ার্র্কি গ্রুপ, এনফরম হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টশন সেন্টার, ইনফরমাল সেক্টর সার্ভিস সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ফর হিউম্যান রাইটস, জুডিশিয়াল সিস্টেম মনিটরিং প্রোগ্রাম, কোরিয়ান হাউজ ফর ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি, মাদারিপুর লিগ্যাল এইড এসোসিয়েশন, ন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস-পাকিস্তান, অধিকার,পার্টনারশিপ ফর জাস্টিস, পিপলস এমপাওয়ারমেন্ট ফাউন্ডেশন-থাইল্যান্ড, পিপলস ভিজিলেন্স কমিটি অন হিউম্যান রাইটস, ফিলিপিনা লিগ্যাল রিসোর্সেস সেন্টার, পুসাত কোমাস, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট, সেফগার্ড ডিফেন্ডারস, সাউথ ইন্ডিয়া সেল ফর হিউম্যান রাইটস এডুকেশন অ্যান্ড মনিটরিং, সুয়ারা রাকিয়াত মালয়েশিয়া, থিঙ্ক সেন্টার এবং ইউনিটারিয়ান ইউনিভারস্যালিস্ট সার্ভিস কমিটি।