সাইদুর রহমান লিংঙ্কন। একজন স্বপ্নচারী মানুষ। সাইকেলিস্ট, নাট্যকর্মী। সাইকেলে সওয়ার হয়ে চষে বেড়িয়েছেন গোটা দুনিয়া। ৩৬টির মতো দেশ তিনি ভ্রমন করেছন। বহন করেছেন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। এখন তিথু হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে। বিস্ময়, বেদনা এবং সুখ এই তিন এর মিশেলে সেই ভ্রমন কাহিনী নিয়মিত লিখছেন প্রবাস নিউজ ডটকমে। বাকিটা শোনা যাক তার কাছেই। এবারের পর্ব সিরিয়া
সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-মধ্যসাগরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি মুসলিম দেশ। এর সীমান্ত দেশগুলো লেবানন, ইসরাইল, জর্ডান, ইরাক, তুর্কী এবং পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে ভূ-মধ্যসাগর। এখানে প্রাচীন সভ্যতার আবির্ভাব ঘটে। সিরিয়া থেকে পৃথিবীতে বর্ণমালার আধুনিকীকরণ শুরু হয়। প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে সিরিয়া ছিল একটি প্রধান বাণিজ্য পথ। উটের মাধ্যমে তারা এই বািণজ্য সম্পন্ন করতো যা ছিল আফ্রিকা, ইউরোপ আর এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। কৃষি কাজের মাধ্যমেও তারা অনেক আয় করে াকে। এর মধ্যে গম, তুলা, বার্লি, ডাল, আংগুর অন্যতম। ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন এবং তুর্কীর কিছু অংশ নিয়ে । এৎবধঃবৎ ঝুৎরধ ছিল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বহু রাজা বাদশাহর হাত বদলে এৎবধঃবৎ ঝুৎরধ অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভাগ হয়ে সিরিয়া এবং প্যালেস্টাইন হয়। সিরিয়া থেকে ভাগ হয়ে চধষবংঃরহব ধহফ ঞৎধহংলড়ৎফধহ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সিরিয়া স্বাধীনতা চায় যার দরুন ফ্রান্স ১৯৪৫ সালে বাধ্য হয়ে তার বাহিনী সরিয়ে নিয়ে যায় আর তখনই সিরিয়া স্বাধীনতার স্বাদ পায়। বহু সিরিয়ান তাদের গ্রেটার সিরিয়া চেয়েছিল কিন্তু জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালে সিরিয়াকে ভাগ করে ইসরায়েল এবং প্যালেস্টাইন প্রতিষ্ঠিত করে।

রাজধানী: দামেস্ক, ভাষা: আরবি (তাছাড়া কুর্দি, আরমেনিয়ান ভাষা ও অঞ্চলভিত্তিক ভাষা ব্যবহৃত হয়)।
অফিসিয়াল নাম: আল জুমহরিয়া আল আরাবিয়া আল সুরিয়া (ঞযব ঝুৎরধ অৎধন জবঢ়ঁনষরপ)
আয়তন: ৭১,৪৯৮ বর্গমাইল, পূর্ব-পশ্চিমে সর্বপেক্ষা দূরত্ব ৫১৫ মাইল, উত্তর-দক্ষিণে ৪৫৫ মাইল।
সর্বোচ্চ উচ্চতা: মাউন্ট হারমোন ৯২৩২ ফুট।
জনসংখ্যা: ৬,১৮০,০০০ জন। (১৯৯৮ আদমশুমারীর মতে)। প্রতি বর্গমাইলে ২২৬ জন বাস করে।
আলওয়া, সাত্বা ছাড়াও খৃষ্টান, ক্যাথলিক এবং কিছু কিছু সংখ্যক ইহুদীর বসবাস আছে।
প্রধান উৎপাদন: তুলা, গম, আঙ্গুর, বার্লি, সিমেন্ট, গ্লাস ইত্যাদি।
কারেন্সী: পিয়াসটেরেস, একশ পিয়াসটেরেস সমান এক পাউন্ড।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে শত চেষ্টার পর একমাত্র সিরিয়ার ভিসা পেলাম তাম আর অর্গানাইজেশনের সুপারভাইজার মান্নানের সুপারিশে। সিরিয়ার রাষ্ট্রদূতের ছেলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এই সুবাদে আমি ভিসা পেয়েছি। কুয়েতে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো আর সম্ভব হল না। ঈদের ছুটিতে প্লেনের টিকেট যোগাড় করা ছিল অনেক মুশকিলের ব্যাপার। ব্যবসায়ী কামালকে সাথে নিয়ে ২/৩টি ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে টিকেটের ব্যবস্থা করলাম। অবশেষে মিলে গেল কিন্তু চড়া দামে।

ঈদের ঠিক এক সপ্তাহ আগে, আমাকে কুয়েত ছাড়তে হল। একদিকে ঈদের ভিড় তারপর আমার সাইকেলটা কিভাবে নিবো প্লেনে করে তা নিয়ে খুব টেনশনে ছিলাম। সাইকেল এবং ব্যাগসহ আমি এয়ারপোর্টের পাশে বাতেন, সোহেলের বাসায় চয়ে যাই। বাংলাদেশ থেকে যে উজ্জ্বলের আমার সফরসঙ্গী হবার কথা ছিল, আমি কুয়েত ছাড়ার একদিন পূর্বে সে কুয়েতে এসে আমার সাথে যোগ দেয়। ওর কাছ থেকে জানলাম ও যখন ইরানের পাট চুকিয়ে কুয়েতে অবস্থান করছি।

যাই হোক, এই ভেবে আশ্বস্থ হলাম, আমার একলা চলার দিন ঘুচল। কিন্তু বিধি বাব! যেহেতু আমার কুয়েত ত্যাগ করার একদিন আগে উজ্জ্বল কুয়েতে এসে উপস্থিত হল, সেহেতু এ যাত্রা ও আমার সফরসঙ্গী হতে পারলো না। সারারাত বাতেন, সোহেল, আলমগীর আর উজ্জ্বলকে নিয়ে গল্প-গুজব করে ভোরবেলা ঘুমাতে যাই, সকাল ৮টায় ফ্লাইট। সারারাত আড্ডা দিয়ে ভোরবেলা বিছানায় গিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ভাগ্যিস যে বন্ধুটাকে ভোরবেলা আসতে বলেছিলাম, এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সে আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়েছিল।

সাইকেল সমেত চলে যাই এয়ারপোর্ট। লাইনে দাঁড়িয়ে পিছনের বড় ব্যাগটা বেল্টে দিয়ে দেই কিন্তু তখনও সাইকেলটার ব্যাপারে নিশ্চিত না, এটা প্লেনে নিবে কি না। তবে ভেবেছিলাম যদি না নেয়, তবে উজ্জ্বলের কাছে দিয়ে দেব, কিন্তু সাইকেলটা দেখিয়ে দেওয়ার পর, ওরা এটাকে বেল্টে না দিয়ে স্টিকার লাগিয়ে সরাসরি নিয়ে গেল আর আমাকে বলল, দামেস্কে গিয়ে তোমার সাইকেল ফেরত নিবে। যাই হোক বাঁচা গেল।

এবার সবাইকে বিদায় জানিয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে চলে যাই প্লেনে। এই জীবনে প্লেনে আরোহণের অভিজ্ঞতা কম নয়। এয়ারওয়েজ এর বিমানবালাদের মাধুর্যমাখা ব্যবহার, প্লেনের ভিতরের সাজানো পরিপাটি অবস্থা সত্যিই প্রশংসনীয়। দামেস্কে পৌঁছতে সময় লাগলো মাত্র এক ঘন্টা। সিরিয়ান সময় তখন সবেমাত্র সকাল দশটা। এয়ারপোর্টে নামার পর পর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দৌড়াতে হয়। এখানেও লাইন। যাহোক, দীর্ঘ সময় পরে বেরিয়ে এসে দেখি সবার মালামালের সাথে আমার ব্যাগ ও সাইকেলটা পড়ে আছে।

আরব অর্গানাইজেশনের সুপারভাইজার এর বন্ধু মি: হারারীর (সিরিয়ান) বাসায় ফোন করবো কিন্তু কোন কয়েন না াকায় পারছিলাম না। পরে এক ভদ্রলোকের সহযোগিতায় এয়ারপোর্টে টেলিফোন বুথে চলে যাই। কথা হয় মি: হারারীর স্ত্রীর সাথে, তবে আমার সাথে নয় ঐ ভদ্রলোকের সাথে। তিনি দো-ভাষীর কাজ করে নিলেন। ঠিকানা লিখে দিলেন কাগজে। অগত্যা বসে থেকে আর কি হবে। এয়ারপোর্টের বাইরে এসে পানি, কলা খেয়ে নিলাম। ২/৩ ঘন্টা ছবি তুলে নিলাম। নীল আকাশ, বড় বড় গাছগুলো বাতাসে পাতা নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে আর খুশিতে সাইকেলে বাংলার পতাকা যেন ওদের অভিবাদনের প্রত্যুত্তর জানাচ্ছে। বিমান বন্দর অনেকটা লোকলয়হীন শহর থেকে কিছু দূরে মর গায়। ঠান্ডা বাতাস বইছে। বাসাতের সাথে সাদা শুভ্র কি যেন ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার মাঝে মাঝে কপালে এসে লাগছে। পরে বুঝতে পারলাম তুষার পড়ছে। কানটুপি পরেও ঠান্ডা থেকে রেহাই পাচ্ছিলাম না। ডিগ্রিতে নেমে গিয়েছে তাপমাত্রা।
অলিম্পিক ফেডারেশনে গিয়ে সাক্ষাত করি, তারা আমাকে সার্টিফিকেট দেয়। অলিম্পিক ফেডারেশন থেকে মি: হারারীর বাসায় ফোন করি। উনি আমাকে তার বাসায় যাবার জন্য তাগাদা দিলেন। এদিকে অলিম্পিক ফেডারেশন আমাকে থাকার জন্য রুম দিল। আমি চাচ্ছিলাম, সেই রুমেই থেকে যাব কিন্তু এতো ঠান্ডা আর রুমে কোন হিটারের ব্যবস্থা না থাকায় আমি যেন জমে যাচ্ছিলাম। বাধ্য হয়েই আবার মি: হারারীর বাসার দিকে রওনা হলাম। সেখানেও আমাদের পুরনো ঢাকার আদলে বাড়ি-ঘর আর অলি-গলি। তবে পুরনো শহর থেকে আধুনিক শহরে যেতে অনেক বেগ পেতে হয়। রাত্র দশটা নাগাদ তার বাসায় গিয়ে পেীঁছলাম। আমার সাইকেলটা গেটের ভেতরে নিয়ে রাখলেন আর ব্যাগটা নীচের রুমে রেখে আমাকে গোসল করে আসতে বললেন। গোসল করে এসে দেখি খাবার টেবিলে খাবার রেখে তার ছেলে-মেয়েরা অপেক্ষা করছে। তাদের এই অপেক্ষা সত্যি মনে রাখার মত। মনে হচ্ছিল বহু বছর থেকে তাদের সাথে চেনা জানা। মি: হারারীর ৪ মেয়ে, ২ ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আর যে মেয়েটা এখন দ্বিতীয় তার বয়স অন্তত ৩০ হবে। কিন্তু আমাদের দেশে হলে ‘আইবুড়ি’ পদবী নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here