গল্পের শুরুটা খুব সাদামাটা। ১৯৫৩ সালের কথা। ২৪ বছর বয়সী একটি ছেলের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল ১৪ বছরের একটি মেয়ের সঙ্গে। সেই সময়ে ফটো দেখে পছন্দ করার প্রচলন ছিল না বললেই চলে। এমনকি পাত্রপাত্রীও একে অপরকে দেখে নেয়ার সুযোগ ছিল না তেমন। তাই ছেলেটির বাবা এবং ছোট ভাই গিয়েছিলেন মেয়েকে দেখতে।

ছেলের জন্য মেয়েটিকে বেশ যোগ্যই মনে হলো বাবার কাছে। মায়া ভরা মুখের সেই মেয়েটিকে প্রথম দর্শনেই পুত্রবধূ হিসেবে পছন্দ করলেন তিনি। ছেলের বাবা শুনেছেন মেয়ে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। সেই সময়ে এত শিক্ষিত মেয়ে পেয়ে দারুণ খুশি ছেলের বাবা। মেয়েটির নাম ইংরেজি এবং বাংলায় লিখতে বললেন। গোটা গোটা অক্ষরে খুব সুন্দর করে মেয়েটি নিজের নাম লিখে মুগ্ধ করলো ছেলের বাবাকে। কোরআন শরীফ পড়ে শোনালো মেয়েটি। ব্যস, বিয়ের কথা পাকাপাকি। যথা সময়ে বিয়ে হয়ে গেলো ছেলেটির এবং মেয়েটির।

প্রথম দেখা বিয়ের আসরে। আড় চোখে বার বার নববধূর মুখ দেখছিল ছেলেটি। আজ থেকে এই মেয়েটিই তার জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী। অপরিচিত মেয়েটিই এখন খুব পরিচিত। মায়া ভরা মুখশ্রীর এই মেয়েটি ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে তাকে সব সময়।

মেয়েটির সেলাইয়ের শখ ছোট বেলা থেকেই। সেলাই শিখেছে পরিবারের বড়দের কাছ থেকে। সুযোগ পেলেই সেলাই করার ঝোঁক ছিল। নতুন কাপড় না পেলে কখনো পুরানো পাঞ্জাবীতে, আবার কখনোও কাঁথায় আঁকতেন ফুল, লিখতেন ভালোবাসার কথা। নতুন সংসারে পা রেখেই বিয়ের পর প্রথম বছরটাকে স্মরণীয় করে রাখতে মেয়েটি কাঠের পিঁড়ির উপর পুরানো সাদা কাপড় রেখে ব্লেড দিয়ে কাটলেন এবং সেটায় দুজনের হাত ধরে রাখার নকশা করলেন। আঁকলেন গোলাপ। সাথে সুই-সুতা দিয়ে লিখে দিলেন ‘শাদী-মোবারক’, ‘প্রথম পরিচয়’। ১৯৫৩ সালের ১৫ই নভেম্বর তারিখটাও লিখে দিলেন সেই কাপড়ে।

প্রথম বছরটাকে স্মরণীয় করে রাখতে হাজেরা বেগম একটা পুরানো সাদা কাপড়ে নকশা করেন।
এতক্ষণ যেই গল্পটা বলা হচ্ছিল সেটা নুরুল আমিন এবং হাজেরা বেগমের। বিয়ের পরে হাজেরা বেগম পরিচিত হন হাজেরা আমিন নামে। গত ১৫ নভেম্বর ছিল তাদের ৬৪ তম বিয়ে বার্ষিকী। তাদের ভালোবাসার সংসার এখন আর দুজনের নেই। তিন ছেলে, চার মেয়ে এবং নাতি-নাতনি নিয়ে অনেক বড় পরিবার তাদের। কিন্তু ভালোবাসা এখনও আগের মতোই সজীব।

নুরুল আমিন জানালেন খুব সাধারণ জীবন যাপন করেছেন তারা। এখনকার মতো দামী উপহার দেয়ার প্রচলন ছিল না তখন। তাই বিয়েতে স্ত্রীকে শুধু অলংকার দিয়েছেন তিনি। তখন চিটাগাং পোর্টে চাকরির সুবাদে সংসার জীবন চট্টগ্রামেই শুরু হয়। কলোনির ৩৫৩/বি ফ্ল্যাটে গড়ে তোলা দুজনের ছোট্ট সংসারটা খুব মিষ্টি ছিল। ছিমছাম, গোছানো সেই সংসারে সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষ করে ফিরে মন ভরে যেত তার। এখানেই সংসার শুরুর বছর সাতেক পরে জন্ম হয় প্রথম সন্তানের।

সংসার জীবন কেমন ছিল জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, খুব সুন্দর। দুজনের বয়সের পার্থক্য দশ বছর হলেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। একদমই রাগারাগি হতো না। আর হলেও একে অপরের রাগ ভাঙাতেন তারা। দুজনের বোঝাপড়া খুব ভালো ছিল। সম্পর্কের প্রতি সম্মান ছিল দুজনেরই। অবসরে হাজেরা আমিন সেলাই করতেন। আরও একটা দারুণ বিষয় ছিল, আর তা হলো তিনি কোন পোশাকটি পরবেন সেটা ঠিক করে দিতেন স্ত্রী। বাইরে যাওয়ার আগেই সেটা গুছিয়ে রাখতেন।

স্ত্রীর হাতের কোন রান্নাটি সবচাইতে পছন্দ জিজ্ঞেস করায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন নুরুল আমিন। স্মৃতির পাতা ঘেঁটে মনে করেন বিয়ের পরে প্রথম যখন নানা শ্বশুর তার বাড়িতে বেড়াতে আসেন, সেই দিনের কথা। সেদিন হাজেরা বেগম মুরগির কোরমা রান্না করেছিলেন। সেই স্বাদ এখনও ভুলতে পারেননি তিনি। এখনও যেন মুখে লেগে আছে সেই কোরমার স্বাদ।

নুরুল আমিন জানান, এখন অবসর কাটে ফেনির বাড়িতে দুজন মিলে ছাদে বাগান করে। তাদের বাগানে আছে বেগুন, লাউ, কুমড়া, মুলা শাক, পালং শাক, লাল শাক, শসা এবং আরও অনেক কিছু। আগের মতো ছিপ দিয়ে মাছ ধরার মতো পুকুর কিংবা উঠানে সবজি চাষ করাতো উঁচু দালানে সম্ভব নয়। তাই নিজেদের হাতে ফলানো ফসল দুজনে মিলে খেতে দারুণ উপভোগ করেন তারা। একাই থাকা হয় এখন। তবে ছেলেমেয়েরা প্রায়ই বেড়াতে আসে নাতি-নাতনিদের নিয়ে, সেই সময়টা খুব আনন্দে কাটে তাদের।

৬৪ বছরেও তাঁদের একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা একটুও কমেনি। অথচ চারপাশে তাকালে দেখা যায়, এখন সম্পর্ক কৃত্রিম এবং ক্ষণস্থায়ী হয়ে গেছে। নুরুল আমিনের মতে, দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর রাখার জন্য একে অপরকে সময় দেয়া জরুরী। সেই সঙ্গে দুজনের বোঝাপড়া ভালো হতে হবে।